মৃৎশিল্পের ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে আধুনিকায়নের আহ্বান


ঠাকুরগাঁও ২৪ নিউজপেপার ডেস্ক প্রকাশের সময় : সেপ্টেম্বর ১৫, ২০২২, ৯:০৮ অপরাহ্ণ /
মৃৎশিল্পের ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে আধুনিকায়নের আহ্বান

এক সময় বরেন্দ্রভূমিতে জনজীবনের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল মাটির তৈরি নানা মৃৎশিল্পের তৈরি আসবাবপত্র। বাঙালির নানা উৎসব ও পূজা-পার্বন যেমন- গায়ে হলুদ, সুন্নতে খতনা, বিয়ে, জন্মদিন, অন্নপ্রাসন, নবান্ন, পহেলা বৈশাখ, পহেলা ফাল্গুনের মতো নানা উৎসবে ব্যবহার হতো মাটির তৈরি তৈজসপত্র।
কিন্তু আধুনিক সভ্যতার আগ্রাসন এবং ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের প্রতি পৃষ্ঠপোষকতায় অনিহার কারণে আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প।

এদিকে সমাজ ও সভ্যতার ক্রম-বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে জায়গা করে নিচ্ছে আধুনিক প্লাস্টিক, সিরামিক, সিন্থেটিক, ধাতব, কাচ ও ম্যালামাইনের বিভিন্ন সামগ্রী। যার কারণে মাটির তৈরি তৈজসপত্রের চাহিদাও দিনকে দিন ফুরিয়ে যাচ্ছে।

রাজশাহীর ঐতিহ্যগত ইতিহাস ঘাটলে দেখা যাবে, এক সময় রাজশাহী শহরে কুমারপাড়ায় তৈরি হতো মাটির শিল্প। কিন্তু কালের পরিক্রমায় মাটির তৈরি আসবাবপত্রের চাহিদা লোপ পাওয়ায় নগরীর কামারেরা ছেড়েছেন তাদের পূর্ব-পুরুষের ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্পের পেশা। এখন নগরীতে একটি ঘরেও হয় না মৃৎশিল্পের কাজ। মাটির এ শিল্পটি যেনো মাটিতেই গেছে।

অথচ, দুই যুগ পূর্বেও নগরীর জিরো পয়েন্ট থেকে শুরু করে আলুপট্টির মোড় ও সাগরপাড়া শিবতলা পর্যন্ত বসত জমজমাট মেলা। পহেলা বৈশাখ, পহেলা ফাল্গুন, উল্টো ও সিধে রথে মেলার আয়োজন হতো। সে সময় শুধু রাজশাহী থেকেই নয় রাজশাহীর বিভিন্ন উপজেলা ও আশ-পাশের জেলা থেকে বিভিন্ন ব্যবসায়ীরা তাদের পণ্য নিয়ে ভিড় জমাতো। ওই সময় মেলায় মাটির তৈরি তৈজসপত্র, হরেক রকমের খেলনা ও সৌখিন আসবাবপত্রের চাহিদাও ছিল বেশ।

বর্তমানে রাজশাহী নগরীতে বছরে একবার বসে রথের মেলা। এ মেলায় মৃৎশিল্পের কদর না থাকায় মৃৎশিল্পের কারিগরেরা তাদের পণ্য নিয়ে আসে না। যার কারণে মৃৎশিল্পের জায়গাটি এখন দখল করেছে কাচ, প্লাস্টিক ও বিভিন্ন ধাতব পণ্য। আর এসব কারণে আগের মতো মেলার জৌলুস বা চাকচিক্যও খুব একটা চোখে পড়ে না। তবে গ্রামাঞ্চলে মেলার আয়োজন হলে কিছু দৃষ্টিগোচর হয় মৃৎশিল্পের তৈজসপত্র।

তারপরও কিছু কিছু নিত্য প্রয়োজনীয় আসবাবপত্রের চাহিদা নগর ও গ্রামজুড়ে থাকার কারণে আজও কোনো রকম টিকে রয়েছে বাংলার ঐতিহ্যবাহী এ ক্ষুদ্র শিল্পটি। রাজশাহীর হাতে গোনা দু’চারটি উপজেলায় ঐতিহ্যবাহী শিল্পটিকে নিজের জীবন ধারনের একমাত্র পেশা হিসেবে নিয়ে ধরে রেখেছে কিছু কুমার পরিবার। তাদের বদৌলতে টিকে আছে এ শিল্পটি।

যেমন ঐতিহ্যবাহী এ শিল্পটি এখনো আঁকড়ে ধরে আছে গোদাগাড়ীর প্রেমতলী কুমারপাড়া এলাকার ২৩টি কুমার পরিবার। বর্তমানে এ গ্রামে ২৫টি কুমার পরিবারের বসবাস হলেও ২টি পরিবার ছেড়েছে এ পেশা। বর্তমানে ২৩টি পরিবার এ পেশায় নিয়োজিত। গ্রামটিতে ঢুকতেই রাস্তার পাশে সারি সারি কাচা, আধা-কাচা মাটির তৈরি পাত্র রোদে শুকাতে দেখা যায়। এছাড়াও রাস্তার একপাশে চারটি বাড়ির সামনে দেখা যায় মাটির তৈরি নানান তৈজসপত্রের সমাহার।

নিত্য ব্যবহার্য হাড়ি-পাতিল, ঘটি-বাটি, শানকি, কলসি, পোড়া মাটির পুতুল, মাটির মূর্তি, অলংকৃত পোড়ামাটির ফলক, মাটির প্রদীপ, ফুলদানি, খোলা, কড়াই, কয়েলদানি, এস্ট্রে, মগ, কলস, ব্যাংক, দৈ এর পাত্র ইত্যাদি সব তৈজসপত্র। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় রুটি বানানো খোলা, কড়াই ও দৈ রাখার পাত্র। শীতকালে ফুলদানি ও ফুলের টব বিক্রি হয় ভালো। এছাড়া একেক সময়ে এক ধরনের জিনিস বিক্রি হয়। তবে দুই যুগ পূর্বে এ শিল্পতে যে প্রাণ ছিল, তা আজ নেই বললেই চলে। এ নিয়ে নানান সমস্যার কথা তারা তুলে ধরেন তারা।

কাঠের গোল চাকতির ওপর মাটি রেখে তা ঘুরিয়ে সুনিপুণ হাতে ফুলের টব তৈরিতে ব্যস্ত ছিলেন প্রেমতলী কুমারপাড়ার মৃৎশিল্পী বিনয় কুমার পাল। তিনি জানান, মৃৎশিল্পের জন্য পর্যাপ্ত মাটি আহরণ ও সংরক্ষণের সমস্যা, বাড়তি খরচ, উন্নত প্রশিক্ষণ, উন্নত যন্ত্রপাতির অভাব ও প্লাস্টিক-সিরামিকসহ ধাতব দ্বারা তৈরি আসবাবপত্রের দৌরাত্মের কথা।

এমন সঙ্কট নিরসনে তার দাবি- উন্নত কলাকৌশলের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে ক্ষুদ্র ঋণ ও উন্নত যন্ত্রপাতির। আধুনিক কলাকৌশলসহ উন্নত হিট মেশিন ও নকশা করার যন্ত্রপাতি পেলে দ্রুত সময়ের মধ্যেই অনেক উন্নতমানের সিরামিক্সের মতো নিত্য প্রয়োজনীয় মাটির পণ্য তৈরি সম্ভব। এতে আবারো মৃৎশিল্পের হারানো ঐতিহ্য ফিরে পাওয়া সম্ভবনাও রয়েছে বলে দাবি মৃৎশিল্পী বিনয়ের।

ওই গ্রামেই কথা হয় আরেক মৃৎশিল্পী গোপাল চন্দ্র পালের সঙ্গে। তিনি বলেন, আমাদের মাটি আনার যেমন সমস্যা, তেমনি মাটি রাখারও রয়েছে সমস্যা। মাটি কাটাতে একজন পাইট বা শ্রমিককে দিতে হয় ৫০০ টাকা। তার ওপর আছে পরিবহন খরচ। আবার মাটি আনার পর তা সংরক্ষণ করতে পারি না। অন্যের মাটিতে রাখলে অনেকেই নানান কথা শোনায়। আবার আমরা এখনো সেই আগের যুগের মতোই জিনিসপত্র বানাই। আধুনিক কলাকৌশল ও যন্ত্রপাতি পেলে আমরাও ভালোকিছু করতে পারতাম।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চিত্রকলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. আমিরুল ইসলাম বলেন, সভ্যতা ও সংস্কৃতির সঙ্গে তাল মেলাতে হলে দেশের ঐতিহ্যবাহী ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পগুলো বাঁচিয়ে রাখা প্রয়োজন। প্রয়োজন ওই সমস্ত শিল্পের সঙ্গে জড়িতদের সরকারি সহযোগিতার। যেমনটি করছে ভারত, চীন, থাইল্যান্ড, নেপালসহ অন্যান্য দেশগুলো। তারা তাদের ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পে আধুনিক যন্ত্রপাতি ও উন্নত কলাকৌশল এবং প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে তাদের স্বীয় ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রেখেছে। এমনকি তাদের ঐতিহ্যবাহী ক্ষুদ্রশিল্পের পণ্যগুলোকে আরো আকর্ষণীয় করে বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে দিচ্ছে।

ঐতিহ্যবাহী শিল্পটিকে টেকানোর বিষয়ে তিনি বলেন, আমাদের দেশীয় ঐতিহ্যকে টেকাতে হলে মৃৎশিল্পীদের আধুনিক যন্ত্রপাতি ও কলাকৌশলের বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। তাদের সহযোগিতায় সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। আমাদেরও মৃৎশিল্প ব্যবহারের মানসিকতা তৈরি করতে হবে। তবেই রাজশাহীতে উন্নতমানের মাটির তৈজসপত্র তৈরি সম্ভব।

রাজশাহীতে মৃৎশিল্পের বিষয়ে জানতে চাইলে রাজশাহী বিসিকের জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) জাফর বায়েজীদ বলেন, মৃৎশিল্প নিয়ে আলাদা কোনো কার্যক্রম নেই। মৃৎশিল্পের বিষয়ে আমাদের কাছে কোনো প্রকারের তথ্য নেই। এগুলো নিয়ে আপনাকে হেড অফিসে কথা বলতে হবে। জেলা কার্যালয়ে যেভাবে নির্দেশনা আসে, আমরা সেভাবেই কাজ করি। বিশেষ কোনো শিল্পকে নিয়ে আমাদের নির্দেশনা থাকলে সেটা নিয়ে কাজ করি।

subscribers