একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর: যা ঘটেছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত ঢাকায়


ঠাকুরগাঁও ২৪ নিউজপেপার ডেস্ক প্রকাশের সময় : ডিসেম্বর ১৬, ২০২২, ৫:১৮ অপরাহ্ণ /
একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর: যা ঘটেছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত ঢাকায়

১৪ ডিসেম্বরই বোঝা গিয়েছিল, পাকিস্তানি বাহিনীর মরণঘণ্টা বেজে গেছে। ঢাকা থেকে রাওয়াল পিন্ডিতে বার্তা পাঠানোর সংখ্যা সেদিন অনেক বেড়ে গিয়েছিল আকস্মিকভাবে। এই সব বার্তায় ফুটে উঠছিল চরম হতাশার সুর।
সকাল ১০টায় প্রেরিত এক বার্তায় বলা হয়, ‘আমরা আশ্বাসের ওপর বেঁচে আছি।… কিছু ঘটবে কী না অনুগ্রহ করে জানান, যা ঘটবার সেটা অতি দ্রুত হতে হবে।’ আরেক বার্তায় বলা হয়, ‘আমাদের কোনো মিসাইল নেই, আমরা কীভাবে গোলা নিক্ষেপ করব? কোনো বিমানবাহিনী নেই। বিমান হামলা হয়ে উঠেছে দুশ্চিন্তার কারণ।’

১৫ ডিসেম্বর দিনটি শুরু হয়েছিল পূর্ব পাকিস্তানে সরকারবিহীন পরিস্থিতিতে এবং বাতাসে পাওয়া যাচ্ছিল আত্মসমর্পণের আভাস। ভেতরের খবর অবশ্য সবার জানা ছিল না, আগের দিন বিকেলে গভর্নর ও নিয়াজির কাছে প্রেরিত বার্তায় প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান জানান, ‘আপনি এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছেন, যখন আর প্রতিরোধ কোনোভাবেই সম্ভব নয়, সেটা কোনো কাজের কথাও হবে না। এখন যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য সব রকম ব্যবস্থা আপনাদের নেয়া উচিত।’ তবে সর্বশেষ এই বার্তাতেও আত্মসমর্পণ কথাটা ঊহ্য রাখা হয় এবং দায়দায়িত্ব চাপানো হয় ইস্টার্ন কম্যান্ডের ওপর।

১৬ ডিসেম্বর, সকাল ১০ টা বেজে ৪০ মিনিট। যৌথবাহিনী ঢাকাতে প্রবেশ করে। এর আগেই অবশ্য বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী তার সহযোদ্ধাদের নিয়ে মিরপুর ব্রিজ দিয়ে ঢাকায় ঢুকে পড়েন। একাত্তরের এই দিনে জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক কর্মকর্তা জন কেলি সকাল বেলায় ঢাকা সেনানিবাসের কমান্ড বাঙ্কারে পৌঁছেন। সেখানে লে. জেনারেল নিয়াজীকে পাওয়া গেল না। বিধ্বস্ত অবস্থায় পাওয়া গেল জেনারেল রাও ফরমানকে।

রাও ফরমান জন কেলিকে বলেন, মিত্রবাহিনীর কাছ থেকে তারা আত্মসমর্পণের প্রস্তাব মেনে নিয়েছে। কিন্তু মিত্রবাহিনীর সাথে তাদের যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ায় এই খবরটি তাদের জানাতে পারছে না। এই সময় জন কেলি রাও ফরমানকে জাতিসংঘের বেতার সংকেত ব্যবহারের প্রস্তাব দেন। এ সময় আত্মসমর্পণের জন্য সময় নির্ধারণ করা হয় বিকেল সাড়ে ৪টা।

সূর্য প্রায় ডুবি-ডুবি। যুদ্ধবিধ্বস্ত শহর ঢাকার অনেক জায়গায় তখনো থেমে-থেমে যুদ্ধ চলছিল, এমনকি প্রাণকেন্দ্রেও চলছিল বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ। এমন পরিবেশের মধ্যেই সন্ধ্যা ৫টার দিকে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) ‘ভারত-বাংলাদেশ যৌথ কমান্ডের কাছে আত্মসমর্পণের জন্য প্রস্তুত পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলের অধিনায়ক জেনারেল আমীর আবদুল্লাহ খান নিয়াজি।

রেসকোর্স ময়দান ততক্ষণে লোকে লোকারণ্য। পাকবাহিনীর জয়েন্ট কমান্ডার লেফটেনেন্ট জেনারেল নিয়াজি পরাজয় স্বীকার করে আত্মসমর্পণ দলিলে স্বাক্ষর করেন। আর যৌথবাহিনীর পক্ষে স্বাক্ষর করেন লেফটেনেন্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা। এছাড়া বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সেসময়ের ডেপুটি কমান্ডার-ইন-চীফ ইয়ার কমডোর এ কে খন্দকার উপস্থিত ছিলেন এই স্মরণীয় অনুষ্ঠানে। প্রায় ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সেনা আত্মসমর্পণ করে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এটাই ছিল সবচেয়ে বড় আত্মসমর্পণের ঘটনা। অভ্যুদয় হলো বাংলাদেশের। এরপরই মুক্তিযোদ্ধারা শহরের পথে-পথে আকাশে রাইফেলের ফাঁকা গুলিতে প্রকম্পিত করে স্লোগান তোলেন—‘জয় বাংলা’।

আত্মসমর্পণের স্মৃতিচারণে বঙ্গবীর সিদ্দিকী বলেছিলেন, হানাদাররা আত্মসমর্পণ করেছে এই খবর যেন কী করে সারা ঢাকায় বিদ্যুতের মতো ছড়িয় গেল। তখন রেডিও টিভি সব বন্ধ ছিল। তবুও খবর জানতে ঢাকাবাসীর দেরি হলো না। ঢাকার আশিভাগ লোকই তখন শহরের বাইরে। অবরুদ্ধ নগরীর বিষণ্ন পরিবেশ বদলে গিয়ে মুক্তির উল্লাসে ভরে উঠল। অন্তরের সর্বস্ব বজ্রকণ্ঠে বারবার উল্লসিত হচ্ছিল জাতীয় অনুভূতি— ‘জয় বাংলা’

সন্ধ্যার পর থেকেই থমথমে ঢাকা তখন বিজয় উৎসবের নগরী। নারী-পুরুষ-শিশু নির্বিবাদে বেরিয়ে আসে পথে। রাতভর আলো জ্বলে নির্ঘুম ঢাকা নগরীর ঘরে-ঘরে। পুরো ঢাকায় মিছিল হচ্ছিল, মিটিং হচ্ছিল। স্লোগান তো চলছেই। যার-যার সামর্থ্য অনুযায়ী আনন্দ উদযাপন করেছে সেদিন।

subscribers